
একটা স্ক্রু খোলার সময় লাগে দশ মিনিট। একটা নামফলক নামানোর সময় লাগে তার চেয়ে সামান্য বেশি। মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটক, দেশের অন্যতম সুরক্ষিত একটা জায়গা, চব্বিশ ঘণ্টা সশস্ত্র পাহারা, প্রতিটা কোণে সিসি ক্যামেরা, সেখান থেকে কেউ একজন হেঁটে এসে রবিউল করিমের নামফলকটা খুলে নিয়ে গেছে। আর প্রতিষ্ঠানটা, যাদের কাজই হলো কে কখন কোথায় ঢুকল-বেরোলো তার হিসাব রাখা, তারা বলছে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এই দাবিটা বিশ্বাস করতে হলে হয় ডিবির নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অপদার্থ মানতে হবে, নয়তো ধরে নিতে হবে সত্যিটা কেউ বলতে চাইছে না। দুটোর কোনোটাই স্বস্তির না।
রবিউল করিম শখ করে মারা যাননি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজানে জঙ্গিরা যখন অতিথিদের জিম্মি করে বসে আছে, তিনি তখন প্রথম সারিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আর বোমার আঘাতে সেখানেই লুটিয়ে পড়েছিলেন। তার নামে গেইটের নামকরণ কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, ওটা ছিল রাষ্ট্রের একটা প্রতিশ্রুতি, যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যে জীবন দেয় তাকে ভোলা হবে না। সেই প্রতিশ্রুতিটাই এখন একটা খালি ফটকের মতো ফাঁকা পড়ে আছে।
সময়রেখাটা মিলিয়ে দেখুন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তোলা ছবিতে নামফলক স্পষ্ট, তখন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ডিবি কার্যালয়ের দেয়ালে স্লোগান লেখা হচ্ছে, ভাঙচুরের চেষ্টা হচ্ছে, তবু কারো হাত ওই নামফলকে পড়েনি। তারপর একটা সময় আসে, কোনো ঘোষণা নেই, কোনো নোটিশ নেই, ফলকটা নেই হয়ে যায়এই নীরব অপসারণ ঘটেছে এমন একটা সময়ে যখন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে গেছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করেছে ঠিকই, জামায়াতের সঙ্গে জোট প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু জামায়াত এখন সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি, ৬৮ থেকে ৭৭টি আসন নিয়ে, দলের আমির শফিকুর রহমান নিজে এখন সংসদ সদস্য। এটা কোনো প্রান্তিক দল না, এটা রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতরে বসে থাকা একটা শক্তি, যাদের কণ্ঠস্বর আইনসভা থেকে প্রশাসন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার সামর্থ্য আছে।
আর জামায়াতের এই উপস্থিতিকে নিরপেক্ষ ইতিহাস হিসেবে দেখার উপায় নেই। দলটার শীর্ষ নেতৃত্বের একটা বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে। আর ২০০১ থেকে ২০০৬, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ঠিক ওই পাঁচ বছরেই জেএমবি প্রকাশ্যে সংগঠিত হয়েছে, অস্ত্র ও জনবল বাড়িয়েছে, আর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একই দিনে দেশের তেষট্টি জেলায় প্রায় একযোগে বোমা ফাটিয়ে নিজেদের শক্তি জানান দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ইতিহাসবিদ বাংলাদেশে খুব বেশি নেই। বিএনপি আর জামায়াত আজ এক টেবিলে বসে সরকার চালাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু একই মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে, একই ভোটব্যাংকের জন্য প্রতিযোগিতা করছে, আর সেই ২০০১-০৬ এর উত্তরাধিকার কেউই সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারে না। একজন জোটে নেই বলে দায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, এই যুক্তি ইতিহাসের সামনে দাঁড়াতে পারে না।
কে সরিয়েছে নামফলক, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর আজও নেই, এটা মানতে হবে সততার সঙ্গে। কিন্তু একটা দ্বিতীয় প্রশ্ন আছে, যেটার উত্তর এড়ানো যায় না। এই ঘটনা ঘটেছে এমন এক রাষ্ট্রযন্ত্রের অধীনে, যার নিয়ন্ত্রণ এখন বিএনপির হাতে, আর যার আইনসভায় জামায়াতের উপস্থিতি উপেক্ষা করার মতো না। এই দুই শক্তির কেউই এই অপসারণ নিয়ে একটা তদন্ত দাবি করেনি, একটা বিবৃতি দেয়নি, একটা প্রশ্ন তোলেনি। জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াইয়ে শহীদ একজন কর্মকর্তার স্মৃতি রাষ্ট্রের নাকের ডগা থেকে মুছে যাচ্ছে, আর যাদের হাতে এখন রাষ্ট্রের লাগাম, তারা একবারের জন্যও থামেনি। এই নীরবতা নিরপরাধ না। ক্ষমতায় থেকে একটা অন্যায় বন্ধ না করাও একধরনের দায়, সেটা সরাসরি হাত লাগানোর দায় না হলেও।
উম্মে সালমা তার স্বামীর কথা বলতে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, অভিযোগ করেননি, দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেননি। এটাই সবচেয়ে করুণ জায়গা। যে রাষ্ট্রের জন্য তার স্বামী জীবন দিয়েছেন, সেই রাষ্ট্রের কাছে তিনি এখনো একটা সহজ ব্যাখ্যা চাইতে দ্বিধা করছেন, কারণ অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে উত্তর আসবে না। রবিউল করিমের নাম ফিরিয়ে আনতে একটা ওয়েল্ডিং মেশিন আর একটা ধাতব ফলক লাগে, এক বিকেলের কাজ। সেটা এখনো হয়নি, কারণ কারো ইচ্ছা নেই। আর যাদের ইচ্ছার অভাব, তাদের নাম আজ বিএনপি আর জামায়াত, দুজনই, একসাথে।